গ্রামীণ ভারতের বেকার যুবক-যুবতীদের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করতে কেন্দ্র সরকার একাধিক প্রকল্প চালু করেছে। এর মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রকল্প হল DDU-GKY যোজনা। এই প্রকল্পের মাধ্যমে গ্রামীণ এলাকার দরিদ্র পরিবারের ছেলে-মেয়েরা বিনামূল্যে দক্ষতা প্রশিক্ষণ নিয়ে নিয়মিত বেতনের চাকরি পাওয়ার সুযোগ পান। শহরের তুলনায় গ্রামাঞ্চলে দক্ষতা প্রশিক্ষণের সুযোগ সীমিত থাকায় বহু যুবক-যুবতী কাজের বাজারে পিছিয়ে পড়েন। ঠিক এই ফাঁকটাই পূরণ করতে এসেছে এই প্রকল্প। এই লেখায় পশ্চিমবঙ্গ সরকারের অফিসিয়াল পোর্টাল এবং কেন্দ্রীয় গ্রামীণ উন্নয়ন মন্ত্রকের তথ্যের ভিত্তিতে প্রকল্পটি সম্পর্কে বিস্তারিত ও নির্ভুল তথ্য দেওয়া হল।
DDU-GKY যোজনা কী?
দীন দয়াল উপাধ্যায় গ্রামীণ কৌশল্য যোজনা, সংক্ষেপে DDU-GKY যোজনা, ভারত সরকারের গ্রামীণ উন্নয়ন মন্ত্রকের (Ministry of Rural Development) একটি স্কিল ট্রেনিং ও প্লেসমেন্ট-লিঙ্কড প্রকল্প। এটি ২০১৪ সালের ২৫শে সেপ্টেম্বর পণ্ডিত দীন দয়াল উপাধ্যায়ের জন্মবার্ষিকীতে চালু করা হয়েছিল। এই প্রকল্পটি জাতীয় গ্রামীণ জীবিকা মিশন বা NRLM-এর একটি অংশ হিসেবে কাজ করে এবং গ্রামীণ পরিবারের আয়ের উৎস বৈচিত্র্যময় করা ও যুবকদের কর্মসংস্থানের আকাঙ্ক্ষা পূরণ করাই এর মূল লক্ষ্য।
প্রকল্পের জন্য প্রায় ১৫০০ কোটি টাকার একটি কর্পাস তৈরি করা হয়েছিল, যা দিয়ে গ্রামীণ যুবকদের কর্মদক্ষতা বাড়ানোর কাজ পরিচালিত হয়। প্রকল্পের ভিশন হল দরিদ্র গ্রামীণ যুবকদের একটি অর্থনৈতিকভাবে স্বনির্ভর ও বিশ্বমানের কর্মদক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তরিত করা।
DDU-GKY প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য
এই প্রকল্পের প্রধান লক্ষ্য হল গ্রামীণ দরিদ্র পরিবারের যুবকদের এমন দক্ষতা প্রদান করা, যাতে তাঁরা ন্যূনতম মজুরি বা তার বেশি বেতনের নিয়মিত চাকরি পেতে পারেন। শুধু প্রশিক্ষণ দিয়েই দায়িত্ব শেষ হয় না; চাকরিতে নিয়োগের পরেও প্রার্থীদের ধরে রাখা এবং তাঁদের কর্মজীবনে উন্নতির উপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। প্রশিক্ষণ শেষে প্রার্থীর অগ্রগতি নিয়মিত ট্র্যাক করা হয়, যাতে তিনি দীর্ঘমেয়াদে কর্মক্ষেত্রে টিকে থাকতে পারেন এবং প্রয়োজনে পদোন্নতিও পেতে পারেন।
প্রশিক্ষণ কোন কোন ক্ষেত্রে দেওয়া হয়
কৃষি, নির্মাণ, খুচরো ব্যবসা, আতিথেয়তা (হসপিটালিটি), স্বাস্থ্য পরিষেবা, তথ্যপ্রযুক্তি ও পোশাক শিল্পসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বাজারের চাহিদা অনুযায়ী প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। কারিকুলাম তৈরি করা হয় ন্যাশনাল কাউন্সিল অন ভোকেশনাল ট্রেনিং (NCVT) বা সংশ্লিষ্ট সেক্টর স্কিল কাউন্সিলের নির্দেশিকা মেনে, যাতে প্রশিক্ষণ শিল্পের বাস্তব চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়। সেক্টরভিত্তিক প্রশিক্ষণের পাশাপাশি ইংরেজি, বেসিক আইটি ও সফট স্কিলের প্রশিক্ষণও বাধ্যতামূলকভাবে দেওয়া হয়, কারণ এই দক্ষতাগুলি যেকোনো চাকরিক্ষেত্রেই প্রয়োজন হয়।
কারা আবেদনের যোগ্য
পশ্চিমবঙ্গ সরকারের পোর্টাল অনুযায়ী যোগ্যতার শর্তগুলি নিম্নরূপ —
- প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের নির্ধারিত শিক্ষাগত ও অন্যান্য শর্ত পূরণ করতে হবে।
- বয়স হতে হবে ১৫ থেকে ৩৫ বছরের মধ্যে (মহিলা, বিশেষভাবে সক্ষম ব্যক্তি এবং বিশেষ প্রান্তিক গোষ্ঠীর ক্ষেত্রে ঊর্ধ্বসীমা ৪৫ বছর পর্যন্ত শিথিলযোগ্য)।
- দরিদ্র বা BPL শ্রেণির পরিবার থেকে আসতে হবে।
- SC, ST, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়, মহিলা ও প্রতিবন্ধী প্রার্থীদের অগ্রাধিকার দেওয়া হয়।
- MGNREGA-তে অন্তত ১৫ দিন কাজ করা পরিবারের সদস্যরাও আবেদনের যোগ্য।
আবেদন পদ্ধতি ও প্রক্রিয়া
আগ্রহী প্রার্থীরা রাজ্যের স্কিল মিশন বা নিকটবর্তী প্রশিক্ষণ পার্টনারের মাধ্যমে নাম নথিভুক্ত করতে পারেন। এছাড়া কেন্দ্রীয় পোর্টাল kaushal.rural.gov.in-এ গিয়ে অথবা Kaushal Panjee মোবাইল অ্যাপের সাহায্যেও রেজিস্ট্রেশন করা যায়। রেজিস্ট্রেশনের পর প্রার্থীকে পছন্দের ট্রেড বা কোর্স বেছে নিতে হয়, তারপর নির্ধারিত প্রশিক্ষণ ও মূল্যায়ন সম্পন্ন করা হয়। প্রশিক্ষণ শেষে সংশ্লিষ্ট প্রকল্প রূপায়ণকারী সংস্থার পক্ষ থেকে চাকরির জন্য সহায়তা দেওয়া হয়। গোটা আবেদন প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ণ বিনামূল্যে, কোনো এজেন্ট বা দালালকে টাকা দেওয়ার প্রয়োজন নেই — এই বিষয়ে সতর্ক থাকা জরুরি।
যোজনার সুবিধাসমূহ
পশ্চিমবঙ্গ সরকারের অফিসিয়াল তথ্য অনুযায়ী এই প্রকল্পের অধীনে যেসব সুবিধা পাওয়া যায়, তা হল —
- সম্পূর্ণ বিনামূল্যে দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ।
- আবাসিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা, অর্থাৎ থাকা-খাওয়ার সুবিধাও অনেক ক্ষেত্রে বিনামূল্যে দেওয়া হয়।
- প্রশিক্ষণ শেষে প্লেসমেন্টের নিশ্চয়তা।
- সফট স্কিল, বেসিক আইটি ও ব্যক্তিত্ব বিকাশের প্রশিক্ষণ।
- চাকরিতে যোগদানের পরেও কর্মজীবনে উন্নতির জন্য পোস্ট-প্লেসমেন্ট সহায়তা পরিষেবা।
- দরিদ্র ও প্রান্তিক সম্প্রদায়ের উপর বিশেষ নজর।
পশ্চিমবঙ্গে DDU-GKY যোজনার বাস্তবায়ন
পশ্চিমবঙ্গে তথ্য ও সংস্কৃতি বিষয়ক দফতরের মাধ্যমে এই প্রকল্পের তথ্য রাজ্যের অফিসিয়াল পোর্টালে প্রকাশিত হয়। রাজ্যের গ্রামীণ যুবক-যুবতীরা নিকটবর্তী প্রশিক্ষণ কেন্দ্র বা রাজ্য গ্রামীণ জীবিকা মিশনের (SRLM) মাধ্যমে যোগাযোগ করে এই সুযোগ নিতে পারেন। কেন্দ্রীয় সরকারের নির্দেশিকা মেনেই রাজ্যস্তরে প্রকল্প রূপায়ণ করা হয়, যাতে প্রকৃত যোগ্য প্রার্থীরাই সুবিধা পান এবং কোনো অস্বচ্ছতা না থাকে।
স্কিল ট্রেনিংয়ের পাশাপাশি ফ্রি অনলাইন কোর্সও করুন
সরকারি প্রশিক্ষণ প্রকল্পের পাশাপাশি অনলাইনেও নিজের দক্ষতা বাড়ানো যায়। যাঁরা ঘরে বসে বিনামূল্যে সার্টিফিকেট কোর্স করতে চান, তাঁরা SWAYAM-এর ফ্রি কোর্স নিয়ে লেখা এই গাইডটি দেখে নিতে পারেন। এতে বিভিন্ন বিষয়ে সরকারি স্বীকৃত ফ্রি কোর্সের তালিকা ও আবেদনের ধাপগুলি বিস্তারিত জানা যাবে। ক্যারিয়ার, ডিজিটাল স্কিল ও অন্যান্য গাইডের জন্য ভিজিট করতে পারেন Biggers Talk Digital।
উপসংহার
সবমিলিয়ে বলা যায়, DDU-GKY যোজনা গ্রামীণ ভারতের দরিদ্র যুবসমাজের কাছে দক্ষতা অর্জন ও কর্মসংস্থানের একটি বিশ্বাসযোগ্য পথ। বিনামূল্যে প্রশিক্ষণ, আবাসিক সুবিধা এবং প্লেসমেন্টের নিশ্চয়তা এই প্রকল্পকে অন্য অনেক স্কিমের থেকে আলাদা করে তোলে। যোগ্যতা থাকলে দেরি না করে নিকটবর্তী প্রশিক্ষণ কেন্দ্র বা অফিসিয়াল পোর্টালের মাধ্যমে আবেদন করে ফেলাই ভালো, কারণ সঠিক দক্ষতা আজকের প্রতিযোগিতামূলক বাজারে একটি স্থায়ী ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে পারে।
তথ্যসূত্র: পশ্চিমবঙ্গ সরকারের অফিসিয়াল পোর্টাল (wb.gov.in) এবং কেন্দ্রীয় গ্রামীণ উন্নয়ন মন্ত্রকের DDU-GKY পোর্টাল (kaushal.rural.gov.in)।


